📰 আসামে নাগরিকত্ব সঙ্কটে সীমান্তে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে মুসলিমরা: বিবিসির রিপোর্ট
📍 বারপেটা, আসাম | ৬ জুন, ২০২৫
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি বৃহস্পতিবার এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, আসামের বারপেটা জেলার একাধিক মুসলিম পরিবার বর্তমানে নাগরিকত্ব সঙ্কটে রয়েছে। গত ২৫ মে ৫৮ বছর বয়সী শোনা বানু নামে এক নারীকে স্থানীয় পুলিশ আটক করে ভারতের সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়।
শোনা বানু জানান, তাকে কোনো অভিযোগ ছাড়াই পুলিশ থানায় ডেকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এবং সেখান থেকে বাংলাদেশ সীমান্তে নেওয়া হয়। সেখানে আরও প্রায় ১৩ জনের সঙ্গে মিলে তিনি সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের জন্য বাধ্য হন।
শোনা বানু বলেন, “আমাকে বন্দুকের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়। এরপর দু’দিন খাবার ও পানির অভাবে মশা-জোঁকের ভিড়ে হাঁটু-পানিওয়ালা মাঠে থাকতে হয়।” পরে বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষ তাদের একটি পুরানো জেলখানার মতো স্থানে রেখে দেয়। দু’দিন থাকার পর কয়েকজনকে ফের সীমান্ত পার করে ভারতীয় সীমান্তরক্ষীদের হাতে হস্তান্তর করা হয়।
বিবিসি জানায়, সম্প্রতি আসামে এমন আরও কমপক্ষে ছয়টি ঘটনা ঘটেছে যেখানে ‘বিদেশি’ ঘোষিত ব্যক্তিদের জোরপূর্বক সীমান্ত পার করে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। তবে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ), আসাম পুলিশ ও রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে এখনও কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
ভারতে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান নতুন নয়। প্রায় ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের বেশিরভাগ অংশ ঝুঁকিপূর্ণ এবং অনুপ্রবেশের সুযোগ রয়েছে। তবে আইনজীবীদের মতে, হঠাৎ করে কাউকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে সীমান্ত দিয়ে বিদেশে ঠেলে দেওয়ার ঘটনা বিরল।
তবে গত কয়েক সপ্তাহে এই ধরনের অভিযান উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের বরাতে বিবিসি জানিয়েছে, মে মাসে ভারত ১২০০ জনেরও বেশি ব্যক্তিকে অবৈধভাবে বাংলাদেশে ঠেলে দিয়েছে, যাদের মধ্যে অনেকে পরবর্তীতে বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ভারতীয় নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি পেয়ে ফেরত এসেছে।
📰 আসামে নাগরিকত্ব সংকটে বাড়ছে সীমান্ত সংঘর্ষ: পুশ ইনের চেষ্টা ঠেকাতে বিজিবির নজরদারি বৃদ্ধি
📍 বারপেটা, আসাম | ৭ জুন, ২০২৫
বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) জানিয়েছে, তারা ভারতের আসামে সীমান্ত দিয়ে অনুপ্রবেশের প্রচেষ্টা ঠেকাতে নজরদারি বাড়িয়েছে। অন্যদিকে, ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার এই বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনও মন্তব্য করেনি।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি জানায়, ভারতের অন্যান্য রাজ্যেও রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে, তবে আসামের পরিস্থিতি বিশেষভাবে সংবেদনশীল। কারণ এখানে নাগরিকত্ব ও জাতিগত পরিচয় দীর্ঘদিন ধরেই রাজনীতির প্রধান ইস্যু।
বাংলাদেশের সঙ্গে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তবর্তী আসামে স্বাধীনতার আগে ও পরে বহু মানুষ ধর্মীয় নির্যাতন ও জীবিকার সন্ধানে এসে বসতি গড়েন। এর ফলে স্থানীয়দের মধ্যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে, জনসংখ্যার ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে এবং তাদের সুযোগ-সুবিধা ও সম্পদ সংকুচিত হচ্ছে।
ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) বহুবার এই ‘অনুপ্রবেশ’ রোধের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর অংশ হিসেবে আসামে জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন (এনআরসি) তৈরির কাজ শুরু হয়। এনআরসি অনুযায়ী, যারা ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চের আগে আসামে এসেছেন, তাদের নাগরিকত্ব স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
তবে এই প্রক্রিয়া জটিল ও বিতর্কিত হয়েছে। ২০১৯ সালে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশিত হলে প্রায় ২০ লাখ মানুষ বাদ পড়ে। অনেককে ডিটেনশন ক্যাম্পে পাঠানো হয় এবং কিছু মামলার বিচার উচ্চ আদালতে চলছিল।
শোনা বানু, যিনি সম্প্রতি বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়েছিলেন, জানান তার মামলা সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন ছিল, তারপরও তাকে সীমান্ত দিয়ে জোরপূর্বক পাঠানো হয়।
আসামের নাগরিকত্ব ও সীমান্ত সমস্যা অব্যাহত থাকায় দুই দেশের মধ্যে জনজীবনে অসন্তোষ ও অনিশ্চয়তা বাড়ছে।
📰 আসামে সীমান্তে ঠেলে দেওয়া হয়েছে বৈধ কাগজপত্রসহ মুসলিমদের: বিবিসির অনুসন্ধান
📍 আসাম | ৮ জুন, ২০২৫
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি জানায়, আসামে কমপক্ষে ছয়টি মুসলিম পরিবার তাদের প্রিয়জনদের সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়েছে, যদিও তারা বৈধ কাগজপত্র সহ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ভারতে বসবাস করে আসছেন।
এই পরিবারের অন্তত চারজন সদস্য সীমান্ত পার হয়ে আবার ভারতে ফিরেছেন, তবে এখনও তাদের জানানো হয়নি কেন তাদের জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।
আসামের মোট জনসংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ২০ লাখ, যার এক-তৃতীয়াংশ মুসলিম। তাদের অনেকেই ব্রিটিশ শাসনামলে এই রাজ্যে এসেছিলেন।
৬৭ বছর বয়সী মালেকা খাতুন, যিনি এখনও বাংলাদেশে অবস্থান করছেন, জানিয়েছেন, তিনি একটি স্থানীয় পরিবারের আশ্রয়ে আছেন। তিনি বলেন, “আমার এখানে কেউ নেই।” তার পরিবারের সদস্যরা তার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন, কিন্তু ফেরত আনার কোনো নিশ্চয়তা নেই। মালেকা খাতুন ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালে ও হাইকোর্টে মামলায় পরাজিত হয়েছেন এবং সুপ্রিম কোর্টে আপিল করেননি।
বিবিসির অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এই ধরনের পুশ ইন ঘটনা বাড়লেও ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী, আসাম পুলিশ ও রাজ্য সরকার থেকে এখনও বিষয়টি নিয়ে কোনো স্পষ্ট বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
আসামের নাগরিকত্ব বিষয়ক বিবাদ ও দীর্ঘদিন ধরে চলমান জনজাতিগত এবং ধর্মীয় রাজনৈতিক উত্তেজনা এখানকার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
আসামে ডিটেনশন সেন্টারে থাকা ‘বিদেশি’দের বিতাড়ন শুরু: মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণা ও আইনি বিতর্ক
আসাম, ২০২৫ – আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা সম্প্রতি ঘোষণা দিয়েছেন, সুপ্রিম কোর্টের ফেব্রুয়ারির নির্দেশ অনুসারে যারা ‘বিদেশি’ হিসেবে ঘোষণা পেয়েছেন এবং ডিটেনশন সেন্টারে রয়েছেন, তাদের ডিপোর্টেশন (বিতাড়ন) কার্যক্রম শুরু করা হবে। শর্মা বলেন, “যারা বিদেশি হিসেবে ঘোষণা পেয়েছেন কিন্তু আদালতে আপিল করেননি, তাদের আমরা বাংলাদেশে ঠেলে দিচ্ছি। যারা আপিল করছেন তাদের হয়রানি করা হবে না।”
তবে এই বিতাড়ন কার্যক্রম নিয়ে আইনি উদ্বেগ এবং সমালোচনা দেখা দিয়েছে। অভিজ্ঞ আইনজীবী আবদুর রাজ্জাক ভূইয়া অভিযোগ করেছেন, “এই অভিযানে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া মানা হচ্ছে না। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সমন্বয়ের কথা থাকলেও তা অনুসরণ করা হয়নি।” তিনি আরও বলেন, “আদালতের নির্দেশকে ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল ব্যাখ্যা করে এই অভিযান চালানো হচ্ছে।”
ভূইয়া সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টে একটি আবেদন করেছেন, যেখানে ‘বাধ্যতামূলক ও অবৈধ পুশ ইন নীতি’ বন্ধের জন্য হস্তক্ষেপ চাওয়া হয়েছে। তবে আদালত তাকে প্রথমে আসাম হাইকোর্টে আপিল করার পরামর্শ দিয়েছেন।
মরিগাঁওয়ের বাসিন্দা রীতা খাতুনের উদাহরণ এই পরিস্থিতির মানবিক প্রভাব স্পষ্ট করে। তার স্বামী খাইরুল ইসলাম, যিনি স্কুল শিক্ষক, ২০১৬ সালে এক ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে ‘বিদেশি’ ঘোষণা পেয়ে দু’বছর ডিটেনশন সেন্টারে ছিলেন। রীতা বলেন, “আমার স্বামীর প্রতিটি নথি ভারতীয় নাগরিকত্বের প্রমাণ, স্কুল সার্টিফিকেট থেকে জমির কাগজপত্র পর্যন্ত। তবুও এসব যথেষ্ট হয়নি।”
রীতা ও তার স্বামীর মামলা এখনও সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন। এই ঘটনায় স্পষ্ট যে, আসামের নাগরিকত্ব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলা উত্তেজনা এবং জটিলতা এখনো অবসান হয়নি।




0 Comments